Monday, August 18, 2014

জমি নিয়ে বিরোধ হলে কী করবেন

জমি জমাকে কেন্দ্র করে যে কোনো সময় বিরোধ দেখা দিতে পারে। অনেক সময় দেখা যায়, নিজের কেনা জমি অন্য কেউ দখল করে মালিকানা দাবি করছে কিংবা জাল দলিল তৈরি করে জমির দখল নিতে চায়। আদালতে মিথ্যা মামলাও ঠুকে দেয়। কিন্তু একটু সচেতন হলেই এ ঝামেলা থেকে অনেকটাই রক্ষা পাওয়া সম্ভব। সে জন্য জানা থাকতে হবে জমি নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে কীভাবে প্রতিকার পাবেন।
ফৌজদারি প্রতিকার জমি দখলকে কেন্দ্র করে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কা দেখা দিলে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৫ ধারা অনুযায়ী প্রতিকার চাইতে পারেন। এ ধারা অনুযায়ী প্রতিকার চাইতে হবে প্রথম শ্রেণীর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে। আর এ মামলা করতে হবে বেদখল হয়ে গেলে কিংবা বেদখল হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেওয়ার দুই মাসের মধ্যে। কোনো মামলা করলে ম্যাজিস্ট্রেট প্রতি পক্ষের ওপর সমন জারি করবেন। পরবর্তী সময়ে উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনবেন এবং সাক্ষ্য প্রমাণ শেষে সম্পত্তির দখলদার কে তা নির্ধারণ করবেন। প্রয়োজনে সরেজমিনে তদন্তের আদেশ দিতে পারেন পুলিশকে। তাদের দেওয়া প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রকৃত দখলদার কে, সে বিষয়ে রায় দেবেন। তবে ১৪৫ ধারায় প্রতিকার চাইতে গেলে এখানে স্বত্ত্ব বা মালিকানা দাবি করা যাবে না। এর মাধ্যমে শুধু প্রকৃত দখলদার নির্ণয় করার জন্য প্রতিকার চাওয়া যাবে।
মালিকানা দাবি করবেন যেভাবে জমির মালিকানা বা স্বত্ব দাবির জন্য দেওয়ানি আদালতের আশ্রয় নিতে হবে। জমি অবৈধভাবে দখলচ্যুত হলে দখল পুনরুদ্ধারের জন্য সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৮ ও ৯ ধারা অনুযায়ী প্রতিকার পেতে পারেন। এ আইনের ৮ ধারা অনুযায়ী জমির মালিক নির্ধারিত পদ্ধতিতে জমিটি পুনরুদ্ধার করার জন্য প্রতিকার চাইতে পারেন। তবে এ ধারা অনুযায়ী, দখলচ্যুত ব্যক্তিকে জমিতে তাঁর স্বত্ত্ব বা মালিকানা আছে কিংবা মালিকানার দাবি রয়েছে, তার ঘোষণা চাইতে হবে। না হলে এ ধারা অনুযায়ী প্রতিকার পাওয়া সম্ভব হয় না। ৮ ধারার স্বত্ত্ব প্রমাণসহ মামলা করার ক্ষেত্রে বেদখল হওয়ার পর থেকে ১২ বছরের মধ্যে মামলা করার সময়সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের মামলাকে সাধারণত স্বত্ত্ব সাব্যস্ত খাস দখলের মামলা বলা হয়।
সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৯ ধারা অনুযায়ী প্রতিকার চাইতে হলে মালিকানা প্রমাণের দরকার নেই। শুধু জমি থেকে দখলচ্যুত হয়েছে এটি প্রমাণ করলেই চলবে। ৯ ধারায় উল্লেখ আছে, যদি কোনো ব্যক্তি বেদখল হন, তবে তিনি বা তাঁর মাধ্যমে দাবিদার কোনো ব্যক্তি মোকদ্দমার মাধ্যমে এর দখল পুনরুদ্ধার করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে যেসব দিক বিবেচনা করা হয়, সেগুলো হলোবাদী অর্থাৎ যিনি প্রতিকার দাবী করেছেন, তিনি জমিটি দখল করে আসছিলেন কি না; বিবাদী তাঁকে জোরপূর্বক বেদখল করেছেন কি না; বিবাদী বে আইনিভাবে জমিতে প্রবেশ করেছেন কি না।
তবে বাদীকে অবশ্যই বেদখল হওয়ার ছয় মাসের মধ্যে মামলা করতে হবে। অন্যথায় এ ধারায় মামলা করার অধিকার হারাতে হবে তাঁকে। তবে সরকারের বিরুদ্ধে এ ধারায় প্রতিকার চাওয়া যাবে না।
কোথায় ও কীভাবে আইনের আশ্রয় নেবেন জমিজমার মালিকানা নিয়ে প্রতিকারের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট এখতিয়ারাধীন আদালতে মামলা করতে হবে। মামলার মূল্যমান চার লাখ টাকার কম হলে সহকারী জজ আদালতে এবং চার লাখের বেশি হলে অসীম এখতিয়ার পর্যন্ত যুগ্ম জেলা জজ আদালতে প্রতিকার চাইতে হবে। মামলা দায়ের করতে হবে আইনজীবীর মাধ্যমে। মালিকানাসহ দখলের প্রতিকার চাইলে জমির মূল্য বাবদ অ্যাড-ভ্যালোরেম (মূল্যানুপাতে) কোর্ট ফি দিতে হবে। ৯ ধারা অনুযায়ী শুধু দখলের জন্য প্রতিকার চাইলে সম্পত্তির মূল্য অনুসারে যে কোর্ট ফি তার অর্ধেক, অর্থাৎ অ্যাড-ভ্যালোরেম কোর্ট ফির অর্ধেক পরিমাণ কোর্ট ফি দিতে হবে। জমির মালিকানাসহ দখল কিংবা শুধু দখল চেয়ে প্রতিকারের ক্ষেত্রে যদি বাদী মনে করেন, তাঁর জমিটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা আছে, তাহলে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা চাইতে পারেন পৃথক আবেদনের মাধ্যমে।
জমি কেনার সময় ক্রেতাদের যা করণীয়
প্রত্যেকের জীবনেই জমি কিনে বাড়ি করার একটা স্বপ্ন থাকে। তবে জমি কেনার সময় কয়েকটা ব্যাপারে ক্রেতাদের সজাগ থাকতে হবে, যাতে পরবর্তীকালে কোন ঝামেলাতে না জড়িয়ে পড়তে হয়।
ভবিষ্যতের দিকে পা বাড়ানোর আগে জেনে নিতে হবে, যে জমিটা কেনা হচ্ছে তার কোন আইনি সমস্যা আছে কিনা।
ক্রেতা যার থেকে কিনছে সে ওই জমিটা বিক্রি করতে পারবে কিনা? সেরকম হলে উকিলের পরামর্শ নিতে হবে, রেজিস্ট্রি করার আগে দেখে নিতে হবে জমিটা এক না অংশীদারি মালিকানার অন্তর্গত।
জমি রেজিস্ট্রেসনের সময় ভুললে চলবে না যে জমিটা কেনা হচ্ছে সেটা কোন বড় সমিতি, বড় কন্সট্রাকশন, বা সরকারি জমির আওতার অন্তর্গত কি না? সেটা মুচলেকাতে লিখিয়ে নিতে হবে ।
জমির টাকা হস্তান্তর করার আগে দেখে নিতে হবে জমিটার মালিক জমির সমস্ত ট্যাক্স, ও অন্যান্য বিল মিটিয়েছে কিনা। সরকারি দপ্তর বা মিনিউসিপালিটিতে খোঁজ নিয়ে তা জেনে নিতে হবে ।
অনেক সময় দেখা যায়, জমির মালিক জমিটা মরডগেজ দিয়ে লোন নিয়েছে। কাজেই জমি রেজিস্ট্রেসনের আগে এটাও দেখার বিষয় যে জমির মালিকের লোনের টাকা পরিশোধ হয়েছে কিনা?
জমি রেজিস্ট্রেসনের আগে দেখে নিতে হবে যে, যে পরিমাণ জমির টাকা দেওয়া হচ্ছে সেই পরিমাপের জমি ক্রেতা পাচ্ছে কিনা? দরকার হলে জমিটি সরকারি কর্মচারী দিয়ে মেপে নিতে হবে ।
আগের সমস্ত অর্থনৈতিক ও আইনি নথি ঠিক থাকলে, একটা চুক্তিনামা করিয়ে নিতে হবে, যাতে ওই জমির মালিক পরে জমির দাম বৃদ্ধি, বা অন্য কোন ক্রেতাকে বেশি মূল্যে জমিটি বিক্রি না করতে পারে ।
একটি ৫০টাকার সরকারি চুক্তিপত্র কিনে তাতে জমিটির মূল্য, আগাম দেওয়া টাকার পরিমান, সময় সবকিছু লিখে নিতে হবে, যাতে কোন পক্ষই আইনি জটিলাতায় না পরে । খুব ভাল হয় যদি এই কাজটি করার সময় দু’পক্ষের উকিল ও দু’জন সাক্ষী থাকে। পাকেচক্রে কোন পক্ষ সমস্যার সম্মুখীন হলে যাতে অপর পক্ষের বিরূদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যায়। রেজিস্ট্রি হল জমির হস্তান্তারের দুপক্ষেরই প্রমাণ পত্র ।
অভয় দিয়ে বলা জেতে পারে উপরিউক্ত বিষয়গুলির ওপর দৃষ্টিপাত করে জমি কিনলে জমির পেছনে টাকা বিনিয়োগ স্বার্থক হবে, ও আইনি কোন সমস্যার মুখেও পরতে হবে না।
জমি ও অন্যান্য সম্পত্তি হস্তান্তরের দলিল ও রেজিস্ট্রেশনের নিয়ম
ভূমি হস্তান্তরের দলিল স্ট্যাম্পের উপর সরকার কর্তৃক প্রকাশিত নির্দিষ্ট ফরমেট বা ছক অনুযায়ী তৈরি করতে হবে। এই ছকে ক্রেতা-বিক্রেতার ছবি সংযোজনের নতুন বিধান রাখা হয়েছে।
তামাদি হওয়ার সময় সীমা
তামাদি হওয়ার সময়-সীমা তিন বছর থেকে এক বছর করা হয়েছে। দলিল তৈরী হওয়ার তিন মাসের মধ্যে তা রেজিস্ট্রেশন করতে হবে।
দলিল রেজিস্ট্রেশনের সময়
দলিল তৈরী হওয়ার তিন মাসের মধ্যে তা রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। মৌখিক দান বা হেবা দলিল রেজিস্ট্রেশন।
মুসলিম পারিবারিক ধর্মীয় আইন অনুযায়ী স্থাবর সম্পত্তি মৌখিক দান বা হেবা দলিলো এখন থেকে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। এই দলিল হবে ঘোষণামূলক। এর জন্য ফি হবে মাত্র ১০০=(একশত) টাকা।
হেবা বা দান কে কাকে করতে পারে: হেবার ক্ষেত্রে শুধু রক্ত সম্পর্কিত আত্মীয় তথা স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে, পিতা-মাতা ও সন্তানের মধ্যে, ভাই-ভাই, বোন-বোন অথবা ভাই-বোন, দাদা-দাদী, নানা-নানী থেকে নাতি-নাতনী ও নাতি-নাতনী থেকে নানা-নানী সম্পর্কের মধ্যে হেবা দলিলে রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে এই নাম মাত্র ১০০ (একশত) টাকা ফিতে রেজিস্ট্রেশনের সুযোগ পাওয়া যাবে।
উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তির রেজিস্ট্রেশন: উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তি রেজিস্ট্রেশন করা বাধ্যতামূলক। তবে এক্ষেত্রে ওয়ারিশগণের মধ্যে সম্পত্তি বন্টন না হওয়া পর্যন্ত রেজিস্টেশন করার প্রয়োজন নেই।
সম্পত্তি বন্ধকের ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রেশন: সম্পত্তি বন্ধকের ক্ষেত্রেও রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এক্ষেত্রে রেজিস্ট্রেশন ফি হবে ২০০ (দুইশত) টাকা থেকে ৫০০০(পাঁচ হাজার) টাকা। আগে যা ছিল ৫০০(পাঁচশত) টাকা থেকে ৫০,০০০ (পঞ্চাশ হাজার) টাকা। এর ফলে বন্ধকি সম্পত্তি কেহ অন্যত্র বিক্রয় করে প্রতারণা বা জালিয়াতির আর কোন সুযোগ পাবে না।
আদালতের মাধ্যমে প্রাপ্ত অগ্রক্রয় সম্পত্তির রেজিস্ট্রেশন: আদালতের মাধ্যমে প্রাপ্ত অগ্র ক্রয় দলিলও রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
বায়না চুক্তির রেজিস্ট্রেশন ও ফি: এখন থেকে বায়না চুক্তি রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। সম্পত্তি বিক্রয়ের জন্য বায়নার ক্ষেত্রে ৫(পাঁচ) লক্ষ টাকা পর্যন্ত সম্পত্তির ক্ষেত্রে ৫০০/-(পাঁচশত) টাকা এবং ৫ লক্ষ টাকার অধিক থেকে ৫০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ১,০০০/-(এক হাজার) টাকা। ৫০ লক্ষ টাকার অধিকমূল্য সম্পত্তির জন্য ২,০০০/-(দুই হাজার) টাকা রেজিস্ট্রেশন ফি দিতে হবে। বায়না নামা রেজিস্ট্রেশন করা ছাড়া চুক্তি বলবৎ করতে আইনগত কোন সুবিধা পাওয়া যাবে না। আবার বায়নার অবশিষ্ট টাকা জমা না করা হলে কোন মামলা মোকদ্দমা করা যাবে না। সম্পত্তি বিক্রয়ের বায়নানামা চুক্তির ৩০ দিনের মধ্যে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে ১লা জুলাই ২০০৫ থেকে এ আইন কার্যকর হওয়ার আগে যেসব বায়না হয়েছে কিন্তু এখনও রেজিস্ট্রেশন হয় নাই সেগুলো ১ জানুয়ারি ২০০৬ এর মধ্যে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। আবার বায়নানামা রেজিস্ট্রেশন না করা এসব চুক্তি কার্যকর বা বাতিল করতে হলে রেজিস্ট্রশনের জন্য নির্দিষ্ট মেয়াদের পর ৬ মাসের মধ্যে মামলা করতে হবে। সম্পত্তি হস্তান্তরের দলিল ৩ মাসের মধ্যে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে।
বিঃ দ্রঃ ভবিষ্যতে মামলা মোকদ্দমা থেকে পরিবারগুলোকে রক্ষা করতে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তির দলিল রেজিস্ট্রেশন করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পূর্বে পুরুষদের আপসে সম্পত্তি বন্টনের দলিল রেজিস্ট্রেশন বার্ধমূলক করার ফলে ওয়ারিশদের ভোগান্তি অনেকাংশে হ্রাস পাবে। মাত্র ২০-(বিশ) টাকা মূল্যের স্ট্রাম্পে দলিল করে তা রেজিস্ট্রেশন করা যাবে এবং সর্বোচ্চ অংশ প্রাপ্ত অংশীদারের সম্পত্তির হিসাব থেকে বাদ দিয়ে অপেক্ষাকৃত কম পরিমাণের অংশীদারদের ভগে পাওয়া সম্পত্তির মূল্য মানের শতকরা আড়াই ভাগ টাকা সব অংশীদারের কাছ থেকে রেজিস্ট্রেশন ফি বাবদ নেওয়া হবে।

মামলা চলাকালে সম্পত্তি হস্তান্তর সম্ভব?

মনে করুন, আপনার একটি জমি পার্শ্ববর্তী এক প্রভাবশালী ব্যক্তি দখল করে নিয়েছেন। শুধু তাই নয়, জমির দাবি প্রতিষ্ঠিত করতে ভুয়া দলিলও বানিয়ে নিয়েছেন। আপনি দেওয়ানি আদালতে মামলা ঠুকে দিলেন। দেওয়ানি মামলা চলতে থাকল বছরের পর বছর। এরই মধ্যে আপনার অগোচরে দখলদার সেই ব্যক্তি মামলাকৃত জমিটি তৃতীয় আরেক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করে দিল। এখন মামলা শেষে আদালতের রায় যদি আপনার পক্ষে আসে, সেক্ষেত্রে আপনি কার কাছে গিয়ে জমির মালিকানা দাবি করবেন? আপনার প্রতিবেশীর কাছে গিয়ে জমি চাইলে তিনি বলবেন, এটি তো বিক্রি হয়ে গেছে। পক্ষান্তরে যার কাছে বিক্রি করা হয়েছে, সেই ব্যক্তির কাছে দাবি নিয়ে গেলে তিনি বলবেন, আমি তো এটি টাকা দিয়েই অমুকের কাছ থেকে কিনেছি। এই জটিলতা নিরসনে আইনের নীতি হলো এই যে, কোনো সম্পত্তি নিয়ে আদালতে মামলা করা হলে, মামলা চলাকালে সেই সম্পত্তি আদালতের অনুমতি ছাড়া হস্তান্তর করা যাবে না।
কমন ল'-এর একটি সুপ্রতিষ্ঠিত নীতি হচ্ছে, 'মামলা রুজু অবস্থায় নতুন কোনো অবস্থার সৃষ্টি করা উচিত নয়। সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের ৫২ ধারায় এই নীতিটিকে 'লিস পেন্ডেন্স' নামে বিধিবদ্ধ আইনে রূপায়িত করা হয়েছে। ৫২ ধারার মূল বক্তব্য হচ্ছে, মামলা চলাকালে মামলার অন্তর্ভুক্ত সম্পত্তি হস্তান্তরিত হলে তার ফলাফল মামলার ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে।
সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের ৫২ ধারায় বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশের ভেতরে বা বাইরে এখতিয়ারবিশিষ্ট কোনো আদালতে স্থাবর সম্পত্তি সম্পর্কে কোনো মামলা বা কার্যক্রম চলাবস্থায় উক্ত মামলা বা কার্যক্রমটি ষড়যন্ত্রমূলক না হলে এবং তাতে সম্পত্তির কোনো স্বত্ব সম্পর্কে প্রত্যক্ষ ও সুনির্দিষ্টভাবে প্রশ্নটি উত্থাপিত করা হলে উক্ত মামলার বা কার্যক্রমের কোনো পক্ষই আদালতের অনুমতি ছাড়া উক্ত সম্পত্তি হস্তান্তর বা অন্য কোনোভাবে ব্যবহার করতে পারবে না, যার ফলে আদালতের সম্ভাব্য কোনো ডিক্রি বা আদেশের দ্বারা লব্ধ কোনো পক্ষের কোনো অধিকারকে ক্ষুণ্ন করবে। তবে আদালত অনুমতি দিলে বা আদালত কোনো শর্ত আরোপ করলে সেই শর্ত অনুসারে তা হস্তান্তর করা যাবে।
৫২ ধারার ব্যাখ্যায় আইনে বলা হয়েছে, এ ধারার উদ্দেশ্যে আরজি দাখিল বা কার্যক্রম শুরু হওয়ার তারিখ থেকে আদালতের চূড়ান্ত ডিক্রি জারি হয়ে সম্পূর্ণ দায় পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত বা তামাদির কাল পার হয়ে যাওয়ার দায় পরিশোধের সময় না হওয়া পর্যন্ত মামলা বা কার্যক্রম চলছে বলে ধরে নিতে হবে।
৩৯ ডিএলআর-এর শ্রী মনোরঞ্জন বণিক ও অন্যান্য বনাম শ্রী নিত্যরঞ্জন কর্মকার এবং অন্যান্য (পৃষ্ঠা-৭৫) মামলায় বলা হয়েছে, 'অগ্রক্রয়ের মামলা দায়ের হওয়ার পর খারিজের দরখাস্তও মামলার কার্যক্রমের অন্তর্গত হবে এবং এক্ষেত্রেও 'লিস পেন্ডেন্স' নীতি প্রযোজ্য হবে।'

নদীতে ভেঙ্গে যাওয়ার ও জেগে উঠা ভূমি সংক্রান্ত আইন

সিকস্তি (Diluvion Lands) ডাইলভিয়ন ল্যান্ডস:
কোন ভূমি ভেঙ্গে নদী বা সাগর গর্বে বিলীন হয়ে গেলে ইহাকে সিকস্তি (Diluvion) বলে।
পয়স্তি ভূমি (Alluvion Lands-এলোভিয়ন ল্যান্ডস): সাগর বা নদীতে কোন ভূমি জেগে উঠলে বা ভেঙ্গে যাওয়ার ভূমি পুনরায় জেগে উঠলে এরূপ ভূমিকে পয়স্তি বলে।
১৯৯৪ সনের ১৫ নং আইন বলে সাবেক ৮৬ ধারা সংশোধন করে তদস্থলে নিম্নরূপ সংশোধনি ৮৬ ধারা প্রতিস্থাপিত হয়েছে। ১৩ জুলাই ১৯৯৪ ইং তারিখে রাষ্ট্রপতি সম্মতি লাভ করে ইহা আইনে পরিণত হয়েছে।
স্টেট একুইজিসন এন্ডটেন্যান্সী এ্যাস্ট ১৯৫০ এর ৮৬ ধারা : সিকস্তি (Diluvion)মূলে খাজনা মওকুফ ও পয়স্তি (Alluvion)মুলে পুঃন জাগরিত ভূমির স্বত্ব/অধিকার (Right) নির্ণয় ।

জমি ক্রয় বিক্রয়

ইস্ট বেঙ্গল এ্যাক্টনং-২৮/১৯৫১, স্টেট একুইজিশন টেন্যান্সি এ্যাক্ট ১৯৫০ এর ৮৮ ধারা অনুযায়ী। একজন রায়ত এই এ্যাক্টের বিধানের শর্ত সাপেক্ষে তার হোল্ডিং বা ইহার অংশ বা খন্ড তার অন্যান্য স্থাবর সম্পত্তির ন্যায় হস্তান্তর করতে সক্ষম।

শর্ত হলো যে, ২০ ধারায়(২) উপধারা মোতাবেক, দখলে রাখা (Retained)চা বসাগনের খাস ভূমি-পূর্বাহ্নের ডেপুটি কমিশনারের লিখিত মজুরী ব্যাতীত হস্তান্তর করা যাবে না এবং প্রস্তাবিত হস্তান্তরের কোন মতেই সামগ্রীকভাবে বা–বাগানের অস্তিত্বকে বিনষ্ট(disrupt)করতে পারবে না বা কোন মতেই যে উদ্দেশ্যে ভূমি দখলে রাখা হয়েছে সেই চা চাষের কোন বিঘ্ন (affect) সৃষ্টি করতে পারবে না।
উক্ত এ্যাক্টের ৮৯ ধারার (১)উপধারায় নিম্নলিখিত ক্ষেত্র ব্যতীত কৃষি ভূমির যে কোন রূপ হস্তান্তর রেজিস্ট্রিকৃত দলিলের মাধ্যমে হতে হবে।
যে সকল ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রির প্রয়োজন নেই:
১। আদালতের ডিক্রির বলে বিক্রয় হলে
অথবা
২। সরকারী দাবী বা পাবলিক দাবী আদায়ের জন্য বেঙ্গল পাবলিক ডিমান্ড রিকভারী এ্যাক্ট, ১৯১৩ এর আওতাধীন দায়েরকৃত সার্টিফিকেট মোকদ্দমা মূলে ভূমি নিলামে বিক্রি বা ক্রয় করা হলে । এবং
(গ)উইল (Bequest)মূলে।
কৃষি ভূমির মালিক: টেস্ট একুইজিশন এন্ড টেন্যান্মি এ্যাক্টের ৮১ ধারার (১) উপাধারর কোন এলাকাল এই অংশের সবটুকু বলবৎ হওয়ার তারিখ হতে সেখানে কৃষি ভূমির মাত্র এক শ্রেণীর স্বত্ব দখলকার যথা “মালিক” খাকবে এবং এরূপ প্রত্যেক মালিকের অধিকার এবং দায় এই অংশের বিধান মোতাবেক নিয়ন্ত্রিত হবে। এই অংশ অর্থাৎ উক্ত এ্যক্টের ৫ম অংশের (৭৯ ধারা হতে ১৫২ ধারা পর্যন্ত) সবটাকু বহুপূর্বেই দেশের সর্বত্র জারী হয়ে বলবৎ হয়েছে। রায়ত, অধীনস্ত রায়ত ইত্যাদি শ্রেণীর দখলকারদের পরিবর্তে এক শ্রেণীর দখলকার যাহা “মালিক” হিসেবে অভিহিত হয়েছে।
অকৃষি ভূমি : উক্ত এ্যাক্টের ৮১ এ ধারার (১) উপধারা, এই অংশে (৫ম অংশ)অন্য কোন রূপ ব্যবস্থা থাকা ব্যতীত অকৃষি ভূমির দখলকার যিনি এই এ্যাক্টের বধিামসমূহের আওতায় এরূপ ভূমির উপরিস্থ স্বত্ব দখল হওয়ার দরুন সম্পর্কের অধীনে প্রজা হয়েছেন তার অধিকার আদায়(Liabiliaties)যে এরূপ দখলের (একুইজিশনের) সময় ইষ্ট বেঙ্গল সব এগ্রিকালচারা টেন্যান্সি এ্যাক্ট ১৯৪৯ এরূপ ভূমির ক্ষেত্রে প্রয়োগ হতো ইহা সেই এ্যাক্ট এর বিধান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত (Regulated)হবে।        

নামজারি (Mutation)

মিউটেশন(Mutation) ইংরেজী শব্দের বাংলা শব্দ হল পরিবর্তন। এখানে খতিয়ানে নাম লেখনভুক্ত করা বা জমিজমার ভাগ বা পরিবর্তনকে বুঝায়। পূর্বেই কলা হয়েছে যে প্রতি মৌজা জরিপ বিভাগ কর্তৃক খতিয়ান প্রস্তুত করার পর নানা স্তরে ইহার পরীক্ষা নিরীক্ষার পর খতিয়ানগুলোকে সরকার জ্ঞিপ্তির মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে ঘোষনা করে থাকেন।
এ সকল খতিয়ানে উল্লেখিত মালিকের নাম, তাদের হিস্যা, স্কত্ব ভূমির পরিমাণ ইত্যাদি। বিক্রী, মর্গেজ উত্তরাধিকার সূত্রে এবং যাবতীয় আইন অনুযায়ী হস্তান্তরসহ সকল উদ্দেশ্যে আইন আদালতসহ সর্বক্ষেত্রে বিবেচিত এ বাহ্য হয়ে থাকে। এক জরীপ হতে আরেক নতুন জরীপ পর্যন্ত প্রায় বিশ(২০) বৎসর সময়ের ব্যবধান। এই সময়ের মধ্যে খতিয়ানে লেখনভুক্ত মালিকের মৃত্যু অথবা বিক্রী ও অন্যবিধ কারণে ভূমি হস্তান্তর হওয়ার দরুন ভূমির মালিকানা স্বত্বের পরিবর্তন আবশ্যক। অন্যথায় বিক্রী, উত্তরাধিকার, মর্গেজ, খাজনা বা কর আদায় ইত্যাদি অসুবিধা হবে।
নামজারি ও খারিজের আইন
         
বর্তমানে মিউটেশনের দায়িত্বে সহকারী কমিশনার (ভূমি) এর উপর ন্যাস্ত। (পূর্বে উপজেলা রাজস্ব অফিসার বা সার্কেল অফিসার রাজস্ব এর উপর ন্যাস্ত ছিল)।
নামজারি দু’প্রকারের হয়ে থাকেঃ
১। মূল খতিয়ানে নাম কর্তন করে ভূমি কিংবা নাম যোগ করে নাম জারি করে এবং
২। কোন খতিয়ানের কোন অংশীদার বা নতুন মালিক খতিয়ান হতে বের হয়ে বা খারিজ হয়ে স্বতন্ত্র খতিয়ান খুলতে চাইলে জমা ভাগ করে স্বতন্ত্র খতিয়ান খুল নামজারি করা হয়।
স্টেট একুইজিশন এন্ড টেনান্সী অ্যাক্টর ১১৬ ধারা মোতাবেক কোন মালিকের একই মৌজায় অবস্থিত তার বিভিন্ন খতিয়ানভুক্ত বিভিন্ন দাগের ভূমি রাজস্ব অফিসারের যজ্ঞ বিক্রয়ের একটি খতিয়ানে একত্রিত বা সমন্বিত করতে পারেন এবঙ উক্তর অ্যাক্টের (১১৭ ধারার ৯১) উপধারা (সি)অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোন একান্নভুক্ত খতিয়ানকে ভাগ করে স্বতন্ত্র খতিয়ান খুলতে পারেন এবং ভাগ করতে হলে রাজস্ব অফিসারের কাছে উক্ত খতিয়ানের এক বা একাধিক অংশীদারগণের আবেদন করতে হবে।
ধার-১১৬: যদি একই গ্রামে বিভিন্ন ভূমি খন্ড একজন মালিকের স্বত্বাধীন হয় এবং ইহা বিভিন্ন খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত খাকলে এরূপ ভূমি খন্ডসমূহ রাজস্ব কর্মকর্তার আদেশ বলে একটি খতিয়ানে একত্রিভুক্ত করা যাবে।
শর্ত হলো যে রাজস্ব অফিসার কর্তৃক এরূপ একত্রিভুক্তির আদেশ করা হবে না যদি মালিকের ইহাতে কোন আপত্তি থাকে এবং উক্ত অফিসারের নিকট যুক্তিসঙ্গত ও যথেষ্ট বলে প্রতীয়মান।
ধারা-১১৭(১): এই অংশের অন্যত্র অন্য কিছু থাকা স্বত্বেও রেভেনিউ অফিসার (এ)১১৬ ধারা অনুযায়ী জোতগুলি(টেন্যান্সি) একত্রিকরনের উদ্দেশ্যে স্বউদ্যোগে অথবা তার বরাবর এক বা একাধিক অংশীদার এতোদ্দেশ্যে আবেদন করিলে কিঙবা বি ১১৯ ধারা অণুযায়ী কোন মালিকের হোল্ডিংগুলো একত্রিত করণের উদ্দেশ্যে রেভিনিউ অফিসার স্বউদ্যোগে অথবা তার বরাবরে এতোদ্দেশ্যে আবেদন করলে কিংবা।
(সি) খাজনা ভাগ করার জন্য একান্নভুক্ত জোত ভাগ করার উদ্দেশ্যে এক বা একাধিক অংশীদার টেন্যান্ট তার বরাবরে আবদেন করলে, অংশীদার টেন্যান্টদের মধ্যে একান্নভুক্ত জোতের এরূপ বিভক্তির এবং বকেয়া সহ যদি থাক খাজনা যেরূপ ন্যায্য ও যুক্তিসঙ্গত বিবেচিত হবে সেভাবে বন্টনের জন্য (রেভিনিউ অফিসার)লেখিত আদেশ দ্বারা নির্দেশ দিবেন।
কিন্তু শর্ত হলো যে, উপস্থিত হওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ে গুনানি গ্রহণ ব্যতিরেকে কোন আদেশ প্রদান করা যাবে না।
আরও শর্ত থাকে যে: উপরোক্ত (সি) অনুচ্ছেদের আওতাধীন কোন আদেশ হলে এবং এরূপ খাজনা বন্টনের ফলে কোন জোতের খাজনা ১.০০(এক) টাকার নিম্নে হলে ইহাকে ১.০০ টাকায় পরিণত করতে হবে অর্থাৎ ১.০০(এক) টাকার নিম্নে কোন জোতের খাজনা বা ভূমি উন্নয়ন করা হবে না।
(২) এই উপধারাটি ১৯৭৬ সনের ই,পি অধ্যাদেশ নং৮(E.P.order VIII of 1967)এর (১৯)ধারা মূলে দেওয়া হয়েছে।
(৩)উপধারা: ১১৭ ধারা ১ উপধারাধীন কোন একান্নভুক্ত হোল্ডিং বিভক্তির আদেশ হলে এরূপ বিভক্তি। ভূমির উপর চিহ্নিত (domareated) করতে হবে এবং ক্যাডাস্ট্র্যাল (Cadastral)করিপের ম্যাপ ইহা প্রদর্শন করতে হবে।